ঢাকার রাজপথে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর টানা সাত দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত থেমে গেল ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির জীবন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদের কাছে যিনি ছিলেন আপসহীন এক লড়াকু মুখ, সেই হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান।
১২ ডিসেম্বর: গুলির মুহূর্ত
জুমার নামাজ শেষে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাচ্ছিলেন ওসমান হাদি। হঠাৎ পেছন থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল থেকে গুলি ছোড়া হয়। কানের পাশ দিয়ে ঢুকে গুলি মাথার অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ওই দিনই দেশজুড়ে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
১৩–১৪ ডিসেম্বর: সন্দেহভাজন চিহ্নিত, তদন্ত জোরদার
পুলিশ জানায়, হামলায় সরাসরি গুলি চালান নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ। চালক ছিলেন আলমগীর শেখ। তদন্তে উঠে আসে, কয়েক মাস পরিকল্পনা করেই এই হামলা চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্তে নামে, ঘোষণা করা হয় ৫০ লাখ টাকার পুরস্কার। একই সময়ে একাধিক সহযোগীকে আটক করা হয় এবং মামলা দায়ের হয় পল্টন থানায়।
১৫ ডিসেম্বর: সিঙ্গাপুর যাত্রা
অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে যান পরিবারের সদস্য ও চিকিৎসক দল। এদিকে তদন্তে জানা যায়, প্রধান সন্দেহভাজনরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে।
১৬–১৭ ডিসেম্বর: সংকট বাড়ে
সিঙ্গাপুরে চিকিৎসকেরা জানান, হাদির আরও অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলেও শারীরিক অবস্থা তা সহনীয় নয়। ১৭ ডিসেম্বর তাঁর অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ বলে জানানো হয়। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নেন এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে বিষয়টি অবহিত করেন।
১৮ ডিসেম্বর: অবসান
দিনভর উৎকণ্ঠার পর ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১০টার দিকে আসে দুঃসংবাদ—ওসমান হাদি আর নেই। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা তদারকিতে যুক্ত কর্মকর্তারা তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। ইনকিলাব মঞ্চ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, এক লড়াকু সহযোদ্ধাকে হারাল দেশ।
ওসমান হাদির মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রস্থান নয়, বরং একটি উত্তাল সময়ের রক্তাক্ত স্মারক হয়ে রইল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে।