রাজধানীর বাউনিয়াবাদ বস্তির বাসিন্দাদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে আইসিডিডিআরবির সাম্প্রতিক গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বস্তির প্রায় অর্ধেক পরিবার প্রতিদিন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় দিন পার করছে। শিশুদের মধ্যে ৫০ শতাংশ খর্বাকৃতির এবং ৫৯ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। প্রসূতি নারীদের ৮০ শতাংশ ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে রয়েছেন।
সোমবার সকালে আইসিডিডিআরবির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রায় পাঁচ হাজার বস্তিতে ৪০ লাখের মতো মানুষের বসবাস। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে ৫০ হাজার মানুষ বাস করেন। এসব এলাকায় ৮০ শতাংশ পরিবার এক কক্ষের ঘরে থাকেন এবং প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবারকে ভাগ করে টয়লেট ও পানি ব্যবহার করতে হয়। ঋণগ্রস্ত পরিবারও এখানে ৯১ শতাংশের বেশি।
গবেষণার প্রধান মোস্তফা মাহফুজ বলেন, বস্তির প্রসূতি নারীরা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৩১৪ শতাংশ বেশি শর্করা গ্রহণ করেন, অথচ তাদের বেশিরভাগেরই ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, লৌহ ও জিংকের ঘাটতি রয়েছে। শিশুদের পুষ্টিহীনতাও গুরুতর; ২৭ শতাংশের উচ্চতা এবং ২০ শতাংশের ওজন বয়স অনুযায়ী কম।
২০২১ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এই নিউট্রি-ক্যাপ প্রকল্পে মোট ১৬,৫৩২টি পরিবারের ৬০,৭৮৬ জন মানুষ অন্তর্ভুক্ত হন। এদের মধ্যে ছিলেন ৭২১ জন প্রসূতি নারী, ৪,২৩৪ জন কিশোরী এবং ২,৪৯৭ জন দুই বছরের কম বয়সী শিশু। প্রকল্পের আওতায় পুষ্টি উপাদান বিতরণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয়।
গবেষণা থেকে দেখা গেছে, এসব উদ্যোগের ফলে প্রসূতি নারীদের ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে, হাসপাতালে প্রসবের হার বেড়েছে এবং গর্ভপাত ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমেছে। পাশাপাশি, কিশোরীদের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ও শিশুদের উচ্চতা-ওজনেও উন্নতি দেখা গেছে।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, বস্তিবাসীরা স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বৈত ব্যবস্থাপনার কারণে সেবা থেকে বঞ্চিত হন। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করছে, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কানাডা সরকারের সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্প প্রসঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত কানাডীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি এডোয়ার্ড ক্যাবরেরা বলেন, “এমন একটি কার্যকর গবেষণায় সহায়তা করতে পেরে আমরা গর্বিত।”
গবেষণা পরিচালক শামস এল আরিফিন বলেন, “এই মডেল ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা হলে দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”
এই গবেষণা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, নগর দারিদ্র্য আর পুষ্টিহীনতার মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন।