আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ মঙ্গলবার শুরু হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি। সকাল পৌনে এগারটায় ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাসে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সময়কাল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত। শুনানির শুরুতেই তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে 'আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টার' অভিযোগ রয়েছে। বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা ‘পারিবারিক স্বৈরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করেছেন এবং তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলেন।
তিন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে পলাতক। তাদের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবী আমির হোসাইন শুনানিতে সময় চেয়ে আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তাকে এক সপ্তাহ সময় মঞ্জুর করে। পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে আগামী সোমবার।
আরেক আসামি, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন আজ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। শুনানিকালে তাকে গারদে শান্তভাবে বসে থাকতে দেখা যায়। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে তার উপস্থিতিতেই হত্যাকাণ্ড, হত্যা প্রচেষ্টা, নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রসহ পাঁচটি মানবতাবিরোধী অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।
বিচারিক কার্যক্রমটি আজ দ্বিতীয় দিনের মতো সরাসরি সম্প্রচার করে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি। শুনানিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন দমন এবং ৫ আগস্ট চাঁনখারপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা, আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা এবং রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবু সাইদের হত্যাসহ একাধিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় গত ১ জুন, এর আগে ১২ মে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা।
পলাতক শেখ হাসিনার পক্ষে আইনজীবী আমির হোসাইন দাবি করেন, “তার বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণিত হয়নি। আমি আদালতে খালাস চেয়ে আবেদন করব।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন মামলা হয়নি। এটি একটি ঐতিহাসিক বিচার।”
চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের আইনজীবী জায়েদ বিন আমজাদ এই পর্যায়ে কোনো শুনানি করবেন না জানিয়ে অভিযোগ গঠনের পর তার যুক্তি উপস্থাপনের সময় চাইলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে।
উল্লেখযোগ্য যে, যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার শাসনামলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয়েছিল, আজ সেই একই ট্রাইব্যুনালে চলছে তার নিজের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমে ব্যাপক রদবদল আনা হয়, যেখানে একাধিক সদস্য অতীতে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম দাবি করেন, “এই বিচার কোনো প্রতিশোধ নয়, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।”